সন্তানের মানসিক বিকাশ ও অভিভাবকের দায়িত্ব

              এম আরিফুজ্জামান\ শিক্ষাব্যবস্থার এক অপরিহার্য ও শক্তিশালী ভিত্তি হলো পরিবার, বিশেষ করে অভিভাবকসমাজ। একজন শিশু বা কিশোর তার জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কাটায় ঘর ও পরিবারের উষ্ণ সান্নিধ্যে।

              তাই সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের গভীর সচেতনতা এবং দূরদর্শিতার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে শহরাঞ্চলের সচেতন অভিভাবকরা সন্তানদের পড়াশোনা ও মানসিক বিকাশ নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি মনোযোগী হয়েছেন। তবে গ্রাম বা মফস্বল এলাকার চিত্রটি এখনো অনেকটাই ভিন্ন। একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমার দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিদিন ক্লাসরুমে ও প্রাত্যহিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে আমি অভিভাবকদের ব্যাপক অসচেতনতা ও উদাসীনতা নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করি।

              শিক্ষকতার টেবিলে বসে যখন খাতা মূল্যায়ন করি কিংবা ক্লাস নিতে গিয়ে দেখি বহু শিক্ষার্থী ক্লাসে চরম অমনোযোগী, ক্লান্ত কিংবা অদ্ভুত এক মানসিক শূন্যতায় ভুগছে; তখন হৃদয়ে গভীর বেদনা সৃষ্টি হয়। খোঁজ নিয়ে প্রায়ই দেখা যায়, সচেতনতার অভাবে অভিভাবকরা সন্তানদের সঠিক মানসিক দিকনির্দেশনা বা কাউন্সেলিং দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছেন। এর ফলে সংবেদনশীল বা ভিন্ন প্রতিভার অধিকারীরা অনেকেই সঠিক পথ হারিয়ে বিপথগামী হয়ে পড়ছে, যা আমাদের সমাজব্যবস্থার জন্য একটি নীরব অশনিসংকেত।

              সন্তানের মানসিক বিকাশ ও অভিভাবকের দায়িত্বঃ শিকড় থেকে শিখরে অভিভাবকরা যখন সত্যিকার অর্থে সচেতন হয়ে ওঠেন, তখন সন্তানের বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। একজন সচেতন অভিভাবক নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ রাখেন, সন্তানের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন এবং সহপাঠীদের সঙ্গে তার আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সবচেয়ে বড় কথা, সচেতন অভিভাবক মাত্রই সন্তানের পরম বন্ধু। সত্যিকারের বন্ধুর মতো তাঁরা সন্তানের ভেতরের পরিবর্তন, না-বলা কথাগুলো এবং না পাওয়ার বেদনাগুলো সহজভাবে বুঝতে পারেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের ভীতি বা জড়তা ছাড়াই এক সাবলীল ও উন্মুক্ত পরিবেশে জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত হয়। শাসন আর স্নেহের এক অপূর্ব ভারসাম্য রক্ষা করে তাঁরা সনতানের চলার পথকে মসৃণ করে তোলেন।

              সন্তান ভুল করতেই পারে এবং এটি স্বাভাবিক বিকাশ প্রক্রিয়ারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ- এই সত্যটি অভিভাবকদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। শাসন বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার অভিভাবকদের থাকতেই পারে, তবে সেই শাসন যেন কখনোই শারীরিক বা মানসিক নিপীড়নে রূপ না নেয় এবং সন্তানের মনে দীর্ঘমেয়াদি ভীতি বা ট্রমা তৈরি না করে। কোনো কিছু রাগের বশে জোর করে বা ধমক দিয়ে চাপিয়ে না দিয়ে যদি ভালোবাসা, ধৈর্য ও যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায়, তবে সন্তান তা সহজে গ্রহণ করে এবং নিজের জীবনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাস্তবায়ন করতে উদ্বুদ্ধ হয়। মনে রাখতে হবে, বল প্রয়োগ করে সাময়িক ভয় দেখানো যায়, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়।

              প্রতিযোগিতার এই যুগে অনেক অভিভাবকের মনে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা রয়েছে যে সারা দিন বই-খাতায় মুখ গুঁজে থাকাই শিকষার্থীর একমাত্র কাজ। এই ধারণাটি শুধু ভুলই নয়; বরং আত্মঘাতী। পড়াশোনা জীবনের একটি অংশমাত্র, পুরো জীবন বা এর সমার্থক নয়। তাই শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপিয়ে দেয়া বোঝা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সৃজনশীল চর্চা, আঁকাআঁকি, গান কিংবা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকানেড অংশ নেয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ তাদের দিতে হবে। মানসিক প্রশান্তি ও আনন্দ ছাড়া শুধু সার্টিফিকেটসর্বস্ব মুখস্থবিদ্যা মানুষের ভেতর ন্যূনতম মানবিকতা তৈরি করতে পারে না। আমাদের সবার আগে প্রয়োজন একটি সুস্থ, প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ।

              পরিবারের দেয়া আনন্দ ও মানসিক প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত হলে শিশুরা ধীরে ধীরে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত পড়ার চাপের ফলে হতাশাগ্রস্ত তরুণ প্রজন্ম অনেক সময় ভুল সঙ্গের প্রভাবে মাদকের মতো ভয়ংকর নেশায় জড়িয়ে নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ চিরতরে বিপর্যস্ত করে তোলে। বর্তমান সময়ের এই অবক্ষয় রোধ করতে হলে অভিভাবকসমাজকে প্রচলিত গতানুগতিক ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু জিপিএ ৫ বা ভালো ফল পাওয়ার অন্ধ মোহে না ছুটে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, তার মনে কোনো কষ্ট বা অভিমান জমে আছে কি না কিংবা সে তার শখের কাজগুলো করার পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে কি না- এসব বিষয় নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে। প্রকৃতির সান্নিধ্য, খোলা মাঠে দৌড়ঝাঁপ এবং সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা আজকের দিনে অভিভাবকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

              শিশুর শৈশবকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রেখে কখনো পরিপূর্ণ মানসিকতার মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। আজকের প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে শিশুদের ওপর যে অদৃশ্য মানসিক চাপ তৈরি করা হয়, তা তাদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তিকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়।              মা-বাবা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু মুখে খাবার তুলে দেয়া বা স্কুলড্রেস গুছিয়ে দেয়া নয়, বরং তাদের আবেগ-অনুভূতির যতœ নেয়া এবং তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলাও আমাদের সমান কর্তব্য। অনেক সময় অভিভাবকরা নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার জেদ অবলীলায় সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। সন্তানকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে- এমন অবাস্তব প্রত্যাশা কোমলমতি মনে তীব্র মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। অথচ কোন ক্ষেত্রে সন্তান প্রতিভাবান বা কিসে তার প্রকৃত সুখ, তা খুঁজে বের করাটাই বুদ্ধিমান অভিভাবকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

              সন্তানকে বড় করার অর্থ শুধু খাওয়া-দাওয়া করিয়ে বা স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে দায় সারা নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মনস্তাত্তি¡ক পরিচর্যা ও স্নেহপূর্ণ বন্ধন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পাঠদান করেন ঠিকই, কিন্তু শিক্ষার আসল ভিত তৈরি হয় পারিবারিক আবহে। তাই অভিভাবকের সজাগ দৃষ্টি, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও আন্তরিক মানসিকতাই পারে শিক্ষকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি সুদৃঢ় সেতু তৈরি করতে। শিক্ষক ও অভিভাবকের এই যৌথ প্রয়াস ও নিবিড় যোগাযোগই পারে একটি শিশুর সঠিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে।

              আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি প্রজন্মের সুস্থ মানসিক বিকাশ মানেই আগামীর একটি সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী। আসুন, অন্ধ মোহ থেকে বেরিয়ে এসে আমরা আমাদের সন্তানকে শুধু ভালো ছাত্র বানানোর যান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত করি এবং সবার আগে একজন সুস্থ, আনন্দিত, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক গুণসম্পন্ন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি। লেখকঃ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার