জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা!

জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ। এটি পশ্চিম এশিয়ার দক্ষিণ লেভান্ট অঞ্চলে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যেরশ একটি আরব দেশের নাম জর্ডান। এ দেশেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং একই দিনে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর চালানো একটি ‘আকস্মিক’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তারা সমন্বিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনটি আগে ঘটেছে—ইরানের হামলা নাকি যুক্তরাষ্ট্র-সৌদির পাল্টা অভিযান— সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এখনও পর্যন্ত।
গতকাল বুধবার (২৯শে জুলাই) ভোরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
যদিও সেন্টকম হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কোন ঘাঁটি বা সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। জর্ডান সরকারও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
তবে আইআরজিসির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জবাব হিসেবেই এ হামলা চালানো হয়েছে।
ওদিকে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির যৌথ হামলা হয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, ইরানের নির্দেশে পরিচালিত এসব গোষ্ঠী গত ৭২ ঘণ্টায় অন্তত ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনা ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো।
ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের হামলায় তাদের অন্তত ২০ যোদ্ধা নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন।
সংগঠনটির দাবি- বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনেভেহ, বসরা, কিরকুক, কারবালা ও দিয়ালা— এই সাতটি প্রদেশে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে, হতাহতের এই সংখ্যা প্রাথমিক এবং মাঠপর্যায়ের পূর্ণ মূল্যায়নের পর তা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন।
কেন হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব? এ প্রসঙ্গে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় যে ড্রোন হামলা হয়েছে, তা ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হয়েছে এবং এর পেছনে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
অবশ্য, এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামের একটি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী। তারা সৌদি আরবের অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মনগড়া’ বলে উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, সৌদি আরব যদি কোনো ‘বোকামিপূর্ণ পদক্ষেপ’ নেয়, তবে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ওদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির মাধ্যমে এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা ‘মারাত্মক ভুল হিসাব’।
অবশ্য, এ বিষয়ে কূটনীতি ও সামরিক চাপ একসঙ্গে।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা গবেষক বুরজু ওজচেলিক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলো একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগও চালিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, ওমান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি প্রস্তাব ইরানের কাছে দিয়েছে, যা তেহরানের প্রতি সম্ভাব্য কূটনৈতিক ছাড় হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সময়ে ওয়াশিংটনে সফর করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, তবে সামরিক চাপও সমানভাবে বজায় রয়েছে।’
কেন জর্ডানকে লক্ষ্যবস্তু করল ইরান? এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার কৌশল অনুসরণ করে আসছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের মার্কিন কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, জর্ডানে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তাদের একটি অংশ মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি, কিং ফয়সাল বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়া-ইরাক সীমান্তসংলগ্ন টাওয়ার-২২ সামরিক লজিস্টিক ঘাঁটিতে অবস্থান করছে।
ওদিকে, ওজচেলিকের মতে, জর্ডানে সর্বশেষ হামলা দেখাচ্ছে যে ইরান এখনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রধান উপায় হিসেবে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে যুদ্ধ কি আরও বিস্তৃত হতে পারে- এ ব্যাপারে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরে অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং সৌদি পতাকাবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। একই সময়ে কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইউক্রেন।
এর ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে এক বার্তায় বলা হয়েছে যে, জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমেদ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহ্বান জানান এবং সৌদি আরবকে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন।
একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
এহেন পরিস্থিতি প্রশমনের ব্যাপারে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেন।
আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস জানিয়েছেন, তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, বর্তমান যুদ্ধবিরতির সময়কাল কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এ সুযোগ কাজে লাগানো না গেলে পরিস্থিতি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
তবে ‘নিয়ন্ত্রিত সংঘাত’ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা সম্পর্কে বুরজু ওজচেলিকের মতে, আপাতত সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো— ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা চলতে থাকবে, পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশ মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এই সংঘাত যদি দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলার রূপ নেয়, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হলে অথবা হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলা আরও বাড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারে যুদ্ধ নতুন ও আরও ভয়াবহ পর্যায়ে। Ref: aljazeera

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *