
তোফায়েল আহমেদ\ বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত একসময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী কচুরিপানা আর দখল-দূষণে এখন মৃতপ্রায়। সময়ের বিবর্তনে নদীটির অনেকাংশ এখন অবৈধ দখলদারদের কবলে। ভরা মৌসুমে ঢেকে থাকে কচুরিপানায়। নাব্যতা হারিয়ে পরিণত হয়েছে মরা খালে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নদীটি একসময় যেমন এলাকাবাসীর আশির্বাদ ছিল তেমনি শোভাবর্ধন করেছিল এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও।
এই নদীর নাম ডাকাতিয়া। তবে কেন এ নাম, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহলের যেন শেষ নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক সময় ডাকাতিয়া নদী ছিলো তীব্র খরস্রোতা। মেঘনার এ উপ-নদীটি মেঘনার মতোই উত্তাল ছিল। ফলে এ নদীর করাল গ্রাসে দু’পাড়ের মানুষ সর্বস্ব হারাতো। উত্তাল এ নদী পাড়ি দিতে গিয়ে বহু মানুষের সলিল সমাধি হয়েছে। ডাকাতের মতো সর্বগ্রাসী ছিল বলে এর নামকরণ হয়েছে ‘ডাকাতিয়া’ নদী। কথিত আছে- ওই সময় এই নদী দিয়ে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা নোয়াখালী ও কুমিল্লায় প্রবেশ করতো। এই নদীতে তাদের মাধ্যমেই ডাকাতি হতো। ডাকাতির উপদ্রবের কারণেই নদীটির নাম ডাকাতিয়া হয়েছে। তাই ডাকাতিয়া নামে খ্যাতি পেয়েছে নদীটি।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডাকাতিয়া নদী বাংলাদেশ ও ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি মেঘনার উপনদী হিসেবেও পরিচিত। নদীটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে আসা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের কাশীপুর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, লালমাই, লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও চাঁদপুরের শাহরাস্তি, হাজীগঞ্জ ফরিদগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে মিশেছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ২০৭ কিলোমিটার। ডাকাতিয়া নদীর গড়ে প্রস্থ হলো ৬৭ মিটার (প্রায় ২২০ ফুট) এবং নদীটির প্রকৃতি হলো সর্পিলাকার। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজার, রাজঘাট ও গাজীমুড়া পর্যন্ত ডাকাতিয়া নদীর দু’পাড়ে দখল করে গড়ে তুলেছে শত শত দোকান ও কলকারখানা। আবার কোথাও কোথাও নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা। বর্তমানে নদীটির কোথাও ২২০ ফুট প্রস্থ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। জৌলুশ হারিয়ে ২২০ ফুটের নদীটি কোথাও ৩০ আবার কোথাও ৪০ ফুটের মরা খালে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে কুমিল্লা ইপিজেড ও কুমিল্লা শহরের যাবতীয় বর্জ্য সিটি করর্পোরেশনের ড্রেন দিয়ে রোহিতা খাল হয়ে সোনাইছড়ি খাল, নতুন ডাকাতিয়া নদী, পুরাতন ডাকাতিয়া, গুইঙ্গাজুড়ি নদীতে শাখা খালের মাধ্যমে এই বর্জ্য গিয়ে নদীতে পড়ে। যার কারণে দূষিত হচ্ছে নদীর পানিও।
ডাকাতিয়ার পানি দিয়ে একদা লাখ লাখ একর জমিতে ইরি-বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ হতো। হাজার হাজার কৃষক এ নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিলো। কিন্তু বর্তমানে পানি এতোটাই দূষিত যে, কৃষক সেচকাজে তা ব্যবহার করতে পারছে না। কেমিক্যালযুক্ত পানি ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এছাড়া, এ নদী একসময় ছিল নৌ-যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চাঁদপুর থেকে লাকসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকা, ট্রলার এমনকি ছোট লঞ্চ চলাচল করতো। নদীপথে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন সহজ ছিল। অথচ নাব্যতা হারিয়ে তা এখন বিলীনের পথে। একসময় ডাকাতিয়া নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মিঠাপানির প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। নদী থেকে মাছ আহরন করে হাজার হাজার জেলে পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। বর্তমানে দূষণের কারণে সেই দেশি মাছও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জেলেরাও অন্য পেশায় চলে গেছে।
ডাকাতিয়া পাড়ের বাসিন্দা মোঃ আমিরুল ইসলাম জানান, একসময় ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন হয়েছে নৌকায়। পরিবহন খরচও ছিল কম। এখন সড়কপথে পরিবহন খরচ অনেক বেশি। ডাকাতিয়া নদী নাব্যতা হারিয়েছে, ইঞ্জিনচালিত নৌকা আসতেও সমস্যা হয়। নদী খননের উদ্যোগ নেয়া দরকার।
আরেক বাসিন্দা আবুল হাসেম বলেন, নদীর সীমানা নির্ধারণ করে একটি সার্ভের মাধ্যমে নিশানা দেয়া দরকার। তাহলে অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ হবে।
লাকসাম বাজার এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে যার সুবিধা মতো নদীর পাড় দখল করে দোকান ঘর নির্মাণ করেছেন। কেউ কেউ নিজে দোকানদারী করছেন আবার কেউ ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। আর এটা একদিনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে ডাকাতিয়া।
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা বলেন, ডাকাতিয়া নদীর হারানো ঐতিহ্য বিশেষ করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার, সরাসরি বর্জ্য পেলে পানি দূষন রোধে উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে নিজ দায়িত্বে ময়লা-আবর্জনা পরিস্কারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি পরিবেশ রক্ষায় ময়লা-আবর্জনা সরাসরি নদীতে না ফেলার জন্য সর্বসাধারনের প্রতি আহবান জানান।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপ-পরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজিব বলেন, মূলত এটা ইপিজেড-এর বর্জ্য নয়; কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তরল বর্জ্য বিশেষ করে বাথরুমের বর্জ্য, রান্নার বর্জ্য, হাসপাতালের বর্র্জ্য ডাকাতিয়া নদীতে চলে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন কলকারখানার দূষিত বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলে বিষাক্ত করে তুলেছে নদীটিকে। নদীর দু’পাড় দখল করে দোকান, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে রেখেছেন। এ বিষয়গুলো সমাধানে পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, দখল উচ্ছেদের বিষয়ে আমরা খুব সহসাই পানি উন্নয়ন বোর্ডে প্রকল্প দাখিল করবো। প্রকল্প অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেলে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।
কুমিল্লা-৬ নির্বাচনী এলাকার জাতীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, কুমিল্লা ইপিজেডের বিষাক্ত ময়লা গুঙ্গাইজুড়ি খালের মাধ্যমে ডাকাতিয়া নদীতে পড়ে। এই বিষাক্ত পানি কৃষি চাষাবাদ এবং মৎস্য চাষে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলছে। তিনি এ ব্যাপারে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টকে সরেজমিন বিষয়টি পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানান।